এনবি নিউজ : ঢাকার হলি আর্টিজানে হওয়া সন্ত্রাসী হামলার ছায়ায় নির্মিত বলিউড সিনেমা ‘ফারাজ’র নির্মাতারা যাতে ওই হামলায় নিহত অবিন্তা কবিরের মা রুবা আহমেদের সঙ্গে আলোচনায় বসে বিরোধ মিটিয়ে নেন, সেই মর্মে আগ্রহ প্রকাশ করেছে দিল্লি হাইকোর্ট। ছবিটির মুক্তি আটকাতে চেয়ে রুবা আহমেদের করা মামলায় হাইকোর্টে পরবর্তী শুনানি হবে ২৪ জানুয়ারি।

আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি পরিচালক হানসাল মেহতা পরিচালিত ‘ফারাজ’ ভারতের সিনেমা হলগুলোতে মুক্তি পাবে বলে ঘোষণা করা হয়েছে। দিনকয়েক আগে প্রকাশ করা হয়েছে ছবিটির ট্রেলারও।

ইতিমধ্যে গত ১৭ জানুয়ারি ঢাকায় সাংবাদিক সম্মেলন করে রুবা আহমেদ জানিয়েছেন, তার নিহত মেয়ের প্রাইভেসি লঙ্ঘন করে ও ভুল তথ্য উপস্থাপন করে ‘ফারাজ’ ছবিটি নির্মিত হয়েছে। তাই তিনি চান এই ছবিটি না দেখানো হোক। এই দাবি নিয়ে তিনি ভারতের আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন।

তবে পরিচালক হানসাল মেহতার পক্ষের অন্যতম আইনজীবী মালবিকা কপিলা কালরা রবিবার (২২ জানুয়ারি) জানান, ‘এটুকু বলতে পারি, দিল্লি হাইকোর্টের বিচারপতিরা ছবির মুক্তির ওপর কোনও ইনজাংকশন দেননি। ফলে এখনও পর্যন্ত সেটির মুক্তিতেও কোনও বাধা নেই। তবে মামলাটি এখনও বিচারাধীন বলে এই মুহূর্তে এর বেশি কিছু বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’

এর আগে গত ১৭ জানুয়ারি এই মামলার সবশেষ শুনানিতে দিল্লি হাইকোর্টে বিচারপতি সিদ্ধান্ত মৃদুল ও তালওয়ান্ত সিংয়ের ডিভিশন বেঞ্চ পরিচালক হানসাল মেহতার আইনজীবীর উদ্দেশে বলেন, ‘আমরা আবেদনকারীদের বলতে পারি আপনাদের সঙ্গে বসে বিষয়টা মিটিয়ে নিতে। আমরা নিশ্চিত নই আইন আমাদের এই ছবিটির মুক্তির ওপর স্থগিতাদেশ জারি করার অধিকার দেয় কি না। কোর্ট কিন্তু সব সময়ই আপনাদের সংবেদনশীল হওয়ার কথা বলতে পারে। এভাবে মুনাফা করবেন না, কারও শোককে কাজে লাগিয়ে আপনারা এভাবে মুনাফা করতে পারেন না। যে কোনও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষই কিন্তু এ কথা বলবেন। দয়া করে আপনারা একসঙ্গে বসে কথা বলুন।’

তবে আদালতের এই বক্তব্য সত্ত্বেও দু’পক্ষের মধ্যে সরাসরি এখনও কোনও আপষ বৈঠক হয়নি।

আইনি বিতর্ক যা নিয়ে

একটি সন্ত্রাসী হামলা নিয়ে পর্দায় কোনও ছবি বানানো হলে সেই হামলায় নিহত ভিক্টিমের প্রাইভেসির অধিকার লঙ্ঘিত হয় কি না এবং ওই ভিক্টিমের অবর্তমানে সেই অধিকার তার নিকটাত্মীয়দের ওপর বর্তায় কি না – এই প্রশ্নকে ঘিরে আলোচিত মামলাটি ভারতে কার্যত এক নজিরবিহীন আইনি বিতর্ক শুরু করেছে।

এর আগে গত বছরের অক্টোবরে দিল্লি হাইকোর্টে একক বিচারপতির বেঞ্চ ‘ফারাজ’ ছবিটির মুক্তির ওপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দিতে অস্বীকার করেন। তার যুক্তি ছিল, প্রাইভেসির অধিকার একান্তভাবেই ‘ইন পার্সোনাম’ (সেই ব্যক্তির নিজস্ব) – মৃত্যুর পর সেই অধিকার তার মা কিংবা আইনি উত্তরাধিকারীরা পাবেন বিষয়টা এমন নয়।

কিন্তু রুবা আহমেদ এই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করলে দিল্লি হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চে এখন তার শুনানি শুরু হয়েছে। মামলায় আবেদনকারী রুবা আহমেদের পক্ষে সওয়াল করছেন সিনিয়র আইনজীবী অখিল সিবাল ও উপিন্দর ঠাকুরের নেতৃত্বে একটি বিশাল টিম। ওই দলে আরও আছেন যতীন গ্রোভার, কপিল মেধা, বর্ষা সিং, আশাবরী জৈন, সান্যা কুমারের মতো আইনজীবীরা।

অন্যদিকে ‘ফারাজ’র নির্মাতা হানসাল মেহতার হয়ে বিবাদীপক্ষের আইনজীবীরা হলেন শাইয়েল ত্রেহান, মালবিকা কপিলা কালরা, হিতেশ জৈন, তানওয়াঙ্গী শুক্লা, মনীষা মানে, রোহন পোদ্দার, ভিগনেশ রাজ প্রমুখ।

গত সপ্তাহে মামলার শুনানিতে রুবা আহমেদের আইনজীবী অখিল সিবাল বলেন, ‘ছবির নির্মাতারা বিষয়টি সম্পূর্ণ ইনসেন্সিভিটি নিয়ে অ্যাপ্রোচ করেছেন। ছবিটি বানানোর আগে তারা নিহতের পরিবারের কোনও ‘কনসেন্ট’ বা সম্মতি নেওয়ার প্রয়োজনই বোধ করেননি।’ সিঙ্গল বেঞ্চে শুনানির আগে ছবিটি তাদের দেখানো হয়নি বলেও তিনি জানান।

মি সিবাল আরও যুক্তি দেন, ‘একজন নিহতের মা বা অন্য প্রিয়জনরা যখন বেঁচে আছেন তখন সেই ব্যক্তির গোপনীয়তার অধিকার তাদের ওপর বর্তায় কি না, প্রশ্নটা তা নিয়েই। ধরা যাক, একজন ব্যক্তি মারা যাওয়ার পর তার সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন কী ছিল, সেটা প্রচার করা হলো। তার পরিবার তখন বলল, না তোমরা এটা করতে পারো না; এই বিষয়টাও সে রকমই। উপরন্তু এখানে এটাও বিচার্য যে কী মর্মান্তিক হিংসার মধ্যে দিয়ে তারা প্রাণ হারিয়েছেন।’

উল্টোদিকে বিবাদীপক্ষের আইনজীবীরা যুক্তি দেন, যে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনাটি পুরোটাই ‘পাবলিক ডোমেইনে’ বা জনসমক্ষে আছে সেখানে একজন ব্যক্তির গোপনীয়তা বা প্রাইভেসি রক্ষার বিষয়টিই অবান্তর।

ডিভিশন বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ

এই মামলায় দিল্লি হাইকোর্ট এখনও তাদের চূড়ান্ত রায় না-দিলেও তারা যে ছবিটির মুক্তিকে বাধাপ্রাপ্ত করতে চান না, সেটা বিচারপতিরা বুঝিয়ে দিয়েছেন। তবে একই সঙ্গে তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, দুপক্ষ নিজেদের মধ্যে আলোচনায় বসে একটি সমাধানসূত্র বের করতে পারলেই সবচেয়ে ভালো হয়।

গত ১৭ জানুয়ারির শুনানিতে বাদীপক্ষের উপস্থাপনার জবাবে বিচারপতি সিদ্ধান্ত মৃদুল মৌখিকভাবে মন্তব্য করেন, ‘বাকস্বাধীনতার নিরিখে আইন কী বলে? আমাদের একটা মুভি দেখান যা এই যুক্তিতে আটকে দেওয়া হয়েছে। মাত্র একটা দেখালেই চলবে। এরকম কত জঙ্গী হামলা হয়েছে – আমরা তো এমন একটাও ঘটনা জানি না যেটা নিয়ে ফিল্ম বানানো হয়নি। মানুষ এরকম সেনসেশনাল বা চাঞ্চল্যকর ছবি দেখতে ভালবাসে। তারা সত্যি ঘটনা অবলম্বনে বানানো ছবি দেখতে চায়।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘মানব সভ্যতার ইতিহাসে বোধহয় এমন একটাও হলোকস্ট নেই যেটা নিয়ে সেলুলয়েডে ছবি তৈরি হয়নি। কী আর করা যাবে!’

হলি আর্টিজানের ঘটনার সঙ্গে একজন ব্যক্তির নিজস্ব গোপনীয়তার যে পার্থক্য আছে সেটা বুঝিয়ে দিয়ে বিচারপতি মৃদুল বলেন, ‘ধরুন আপনার বাড়ির ভেতরে কী ঘটছে সেটা সারা দুনিয়াকে জানিয়ে একজন বিকৃত আনন্দ পেতে পারেন। কিন্তু এখানে ঘটনাটা তো পাবলিকক ভিউতে, অর্থাৎ সবার চোখের সামনে ঘটেছে। এই ধরনের ঘটনার কভারেজ হতে বাধ্য।’

কিন্তু এর পাশাপাশি যে বিচারপতিরা দুপক্ষের মধ্যে আলোচনার দরজা খোলা রাখতে চাইছেন, সেটাও তারা স্পষ্ট করে দিয়েছেন।

হানসাল মেহতার আইনজীবীদের উদ্দেশে ডিভিশন বেঞ্চ বলেছে, ‘ওনাদের সঙ্গে কথা বললে তো কোনও ক্ষতি নেই। আমরা এখানে অধিকারের কথা বলছি না, বলছি একজন মায়ের অনুভূতিটা (সেন্টিমেন্ট) বোঝার কথা। ওনার সঙ্গে কথা বলুন। আমরা শুধু আপনাদের বলছি এই পথেও একবার চেষ্টা করতে, যদি পারেন সবাই একসঙ্গে বসে বিষয়টা মিটিয়ে নিন। আপনাদের পারা উচিত।’

এই পটভূমিতেই মামলার পরবর্তী শুনানি হবে মঙ্গলবার (২৪ জানুয়ারি); ‘ফারাজ’ নিয়ে দিল্লি হাইকোর্টের চূড়ান্ত রায়ও সেদিনই জানা যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এ টি